মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

মুজিবনগর উপজেলার ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান এই উপজেলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি গঠনে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত এই উপজেলাকে ঘিরে রয়েছে পশ্চিমে ভারতের নদিয়া জেলা, উত্তরে মেহেরপুর সদর উপজেলা, পূর্বে মেহেরপুর সদর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুরহুদা উপজেলা, দক্ষিনে দামুরহুদা ও ভারতের নদিয়া জেলা। এখানে ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের অন্যান্য উপজেলার মতই, তবুও কিছুটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন কথ্য ভাষায় মহাপ্রাণধ্বনি অনেকাংশে অনুপস্থিত, অর্থাৎ ভাষা সহজীকরণের প্রবণতা রয়েছে। মুজিবনগর উপজেলার আঞ্চলিক ভাষার সাথে সন্নিহিত ভারতের নদীয়া জেলার ভাষার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। ভৈরব নদীর গতিপ্রকৃতি এবং মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স এর আগত গোটা বিশ্বের অতিথিবৃন্দ এলাকার মানুষের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এই এলাকার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মুজিবনগর এর সভ্যতা বহুপ্রাচীন। এই এলাকায় প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলতে তেমন কিছু নেই। তবে প্রাচীন সভ্যতার বাহক হিসেবে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে অনেক সু-কারুকাযময় ভবন। এখানকার গ্রাম, মহল্লা বা পাড়ার নামকরণ হয়েছে তৎকালীন জমিদার দের নামে।  সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে মুজিবনগর অবদানও অনস্বীকার্য। উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তিত্ব না থাকলে সাংস্কৃতিক অংগন আজও উজ্জল হয়ে আছে এই মুজিবনগরে।

 

দারিয়াপুরের আঞ্চলিক ও প্রচলিত ভাষা:

নদীয়া জেলার শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর অঞ্চলের ভাষা দেশবিভক্তির পূর্ব থেকে মেহেরপুর অঞ্চলে প্রচলন রয়েছে। এই দুই এলাকার অধিকাংশ মানুষ ১৯৪৭ সালের পরে দারিয়াপুরসহ সমগ্র মেহেরপুর ও মেহেরপুরের পার্শ্ববর্তী এলাকাতে এসে বসবাস করেছেন। বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলের প্রচলিত ভাষার সাথে মেহেরপুরের  আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। এখানকার ভাষা শ্রুতিমধুর, সুস্পষ্ট এবং চলিত। সমগ্র মেহেরপুর জেলাতে দারিয়াপুর একটি শিক্ষিত গ্রাম হিসেবে পরিচিত। দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিশেষকরে দারিয়াপুর গ্রামের অধিবাসী নিত্যদিনে কথ্য ভাষায় যেভাবে কথা বলে তা পুরোপুরি কেতাবী ভাষা বলা চলে। তবে এই গ্রাম ছাড়া অন্যান্য গ্রামের মানুষেরা যে সমস্ত কথ্য ভাষা ব্যবহার করে থাকে তা বেশ একটু ভিন্নতর। যেমন, আতি উটি খাবো অর্থাৎ (রাতে রুটি খাবো) ‘র’ এর উচ্চারণ ‘অ’ দিয়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আরেকটি বাক্য আমি “বুইলতি পারিনি” অর্থাত (আমি বলতে পারিনা)। দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় এধরনের কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্তমানে শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে এধরনের আঞ্চলিক ভাষা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে এবং সেখানে কেতাবী ভাষা স্থান দখল করে নিচ্ছে।

মেহেরপুর অবিভক্ত নদীয়া জেলার অন্যতম প্রাচীন এতিহ্যময় একটি মহুকুমা। নদীয়া মহুকুমা তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত সমগ্র বাংলার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। এ সম্পর্কে বিখ্যাত গবেষক ড: মুহম্মদ এনামুল হক তার বঙ্গে সূফী প্রভাব গ্রন্থের ১৯৬-১৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, “বাঙালাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল নদীয়া”।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর কুষ্টিয়ায় লালন শাহের লালনগীতির ব্যাপক চর্চার প্রভাব দারিয়াপুর ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া দারিয়াপুর ইউনিয়নের লোক সংস্কৃতি বাউলগীতি, আঞ্চলিক গীতি, নাট্য চর্চা, ভাসানগান ও মানিকপীরের গান, জারি গান, সারী গান, মুর্শিদীগান, পালা গান, পুঁথিগান উল্লেখ্যযোগ্য।

দারিয়াপুর ইউনিয়নের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন দিক এ অধ্যয়ে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো:

দারিয়াপুরের লোক সংস্কৃতি:  মেহেরপুর জেলা নদীয়ার প্রাচীন জনপদ হওয়ায় লোকসংস্কৃতি বা গ্রামীণ সংস্কৃতি বিভিন্ন চর্চার মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে এ ইউনিয়নে এক ঐতিহ্যের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। বাঙালীর সমাজজীবনে নানা উৎসব আয়োজন নানা ধরনের গীত, কবিগান, ভাবগান পুথিপাঠ, মেঠো গান, মানসার গান, ভাসানগান, ছেলে নাচানো গান, মানিকপীরের গান, বোলান গান, অষ্টগান, গাজীর গীত ও কৃষ্ণযাত্রা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বাউলগীতি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ক্ষ্যাত মুজিবনগর উপজেলার অন্যতম ইউনিয়ন হচ্ছে দারিয়াপুর। কুষ্টিয়ার বাউল সম্রাট লালন শাহ্ এর প্রভাবে মেহেরপুর জেলায় অসংখ্য বাউল অনুরাগী ও বাউল সঙ্গীতে পারদর্শী গায়কের সৃষ্টি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দারিয়াপুর ইউনিয়নেও বাউল গানের চর্চা বেশ উল্লেখযোগ্য। দারিয়াপুর ইউনিয়নে এখনো বহু বাউল অনুরাগী বিদ্যমান। লোকসংস্কৃতির অন্যতম বাহক বাউল সঙ্গীত, লালনের জীবনাদর্শ তাদের ব্যক্তিজীবনে  চর্চা অব্যাহত রেখেছেন।
মানিক পীরের গান মানিক পীর মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের গৃহস্থের নিকট সমভাবে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন। মেহেরপুরের লোক সংস্কৃতি ঐতিহ্যে মানকিপীরের গান এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে বুড়িপোতা ও পিরোজপুর ইউনিয়নের গ্রমাগুলোতে গানের অত্যাধিক প্রচলর রয়েছে। দারিয়াপুর ইউনিয়নেও মাঝে মাঝে মানিক পীরের গানের জলসা অনুষ্ঠিত হয়। পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে মানিকপীরের গান গেয়ে কেউ কেউ বাড়ী বাড়ী ভিক্ষা করে বেড়ায়। এই এলাকার মানিক পীরের অনুরাগীদের গাওয়া গানের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:
“মানিকের নামে তোমরা হেলা করো না
মানিকের নাম থাকলে বিপদ হবে না।
মানিকের নামে চালপয়সা যে করিবে দান
গাইলে হবে গরু বাছুর ক্ষেতে ফলবে ধান।”
ভাসান গান দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ভাসান গানের গায়ক রয়েছে। তারা অন্য এলাকার গায়কদের সাথে দল বেঁধে ভাসান গান উপস্থাপন করে থাকে। এই গানের বৈশিষ্ট হলো: তিনটি পালা করে গায়করা গান গেয়ে থাকেন। জন্মপালা, বাঁচার পালা ও মৃত্যুপালা। মৃত্যু পালা হচ্ছে  শ্রোতাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। শীতকালে বাড়ী বাড়ী ভাসান গানের আসর বসে থাকে। সারারাত ধরে এ গানের আসর চলে। ভাসান গানের কিছু  অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:
“ওকি সাধ আছে হে দিতে লকায়ে বিয়ে
আর কিছুদিন রাখবো ঘরে ধলো খেলা দিয়ে।”
বিয়ের গান লোক সংস্কৃতির ভান্ডার অফুরন্ত। প্রতিনিয়ত এর উপাদান বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আধুনিকতার উষ্ণ আবেদনের প্রেক্ষিতে অতীতের অনেক মূল্যবান লোকসংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। তবে এই ই্‌উনিয়নের গ্রামগুলোতে লিখতে পড়তে না জানা  মেয়েরা অনায়াসে শত শত পুংক্তি বিয়ের গান অনর্গল মুখস্ত বলে যেতে পারে। এ সমস্ত গান তারা নিজেরাই সৃষ্টি করে থাকে।
বিয়ের গান: “দুলাভাই গিয়েছে শহরে,
আনবে নাকের নথ রে
সেই নথ নাকে দিয়ে
নাক ঘুরিয়ে নাচবো রে।”
আরেকটি বিয়ের গানের কিছু অংশ:
“গাঙ্গের ধারে বাধলাম বাড়ি
ডাবি নারিকেল সারিসারি
আমি বিবিকে পরাতে চেয়েলাম
মানিকরতন।”
সারী গান এই গান হচ্ছে কর্ম সংগীত। মেহেরপুর অঞ্চলে সারী গানের প্রভাব আজো বিদ্যামান। পাকা ঘরের জলছাদ পেটানো কোন ভারী কাজের সময় মনে জোর সৃষ্টির জন্য সারীগান গাওয়া হয়ে থাকে।
জারীগান জারীগান মূলত: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে  সৃষ্টি। মেহেরপুর অঞ্চলে জারীগান মহররমের সময় গায়করা দলবদ্ধ হয়ে বাড়ীবাড়ী গেয়ে  বেড়ায়। যাদবপুরের বেলাল হোসেন বয়াতি জারীগানের গায়ক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও অনেক জারীগায়ক দল এ অঞ্চলে রয়েছে। জারীগানের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো:
“ঈমান যে না আনিবে মক্কার উপরে
গুনাগার হয়ে যাবে দোযখ মাজারে
আরে রোমের ও শহরে ছিল
ইব্রাহিম পায়গম্বর.........
বহুদিবস বাদশাহী করে  এই দুনিয়ার পর।”
শাস্ত্রগান একটানা বাদলার দিনে শাস্ত্র গানের কদর দেখা যায়। জমিতে নিড়ানোর সময় অথবা ধান লাগানোর সময়ে শাস্ত্র গান গাওয়া হয়। গ্রামের গৃহস্তের বাড়ীর  বৈঠক খানায় বৃষ্টির দিনে কখনো কখনো শাস্ত্রগানের আসর বসে থাকে। শাস্ত্রগানের কাহিনী অনেকটা বর্ণনামুলক। শাস্ত্রগানের উপমা।
“ইমান খাঁটি ভবের খুটি শাস্ত্রের পরিচয়
ইমান দিয়ে দেলকে আগে খাঁটি করা চাই,
নইলে নামাজ হবে নয়
আছে সত্য ঠিক যথার্থ তোমারে জানাই।”
পুঁথিগান

দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এখনো পুঁথিগানের জলসা বসে থাকে। গরমের দিনে জোৎস্না রাতে গ্রামের রাস্তার মোড়ে বাদকগন গোল হয়ে বসে এবং তাদের চতুর্দিকে ‍ঘুরে ঘুরে গায়ক এ গান গেয়ে থাকে। প্রচুর লোক সমাগম হয়ে থাকে এই সকল জলসায়। এধরনের পুঁথিগান হলো:

“ওরে ভাই বলি তাই আজব ঘটনা
ওরে সাপ খেলাই সাপুড়ের মেয়ে
নামেতে জরিনা
জরিনার মা নাই বাপ নাই
দাদির  কাছে থাকে”।

এছাড়াও বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী, বিশ্বকর্মার কাহিনী ইত্যাদি প্রসিদ্ধ।

ভাটিয়ালী গান দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এক সময় ভাটিয়ালী গানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ইদানিংকালে অনেক কমে গেছে। গরুর গাড়ীর গাড়োয়ান, নৌকার মাঝি এবং মাঠের রাখালী ভাটিয়ালী গানের গায়ক হিসাবে আজো এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতিকে ধারণ করে রেখেছে।
পালা বা যাত্রাগান পালা বা যাত্রাগান মেহেরপুরের সর্বত্র এখনো পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি লোকসংস্কৃতি হিসেবে বিদ্যামান। রূপবান, ভাসানযাত্রা, ইমামযাত্রা, আসমান সিংহের পালাগান উল্লেখযোগ্য। শীতকালের পুরো সময়টুকু এখানকার গ্রামাঞ্চলে, এমনকি মেহেরপুর শহরের কেন্দ্রস্থলেও যাত্রাগানের আসর বসে থাকে। 
প্রচলিত খেলাধুলা প্রাচীনকাল থেকেই দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের খেলাধুলা হয়ে আসছে। এর মধ্যে হা-ডু-ডু, ডাংগুলি, গাদন, মার্বেল, লাঠিখেলা, নৌকাবাইছ, ঘুড়ি উড়ানো, উল্লেখযোগ্য। দাবা, তাস, লুডু, বাঘবন্দী, পাশা খেলা এ অঞ্চলে বহুকাল ধরেই চলছে। উনিশ শতকের দিকে আধুনিক খেলার মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, টেবিল টেনিস, হ্যান্ডবল এছাড়াও কেরামসহ প্রভৃতি খেলা দারিয়াপুর ইউনিয়নে প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীন ঐহিত্যবাহী খেলাধূলার সাথে বর্তমানে দারিয়াপুর ইউনিয়নের আধুনিক খেলার মান এবং অনুশীলন বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফুটবল ফুটবল খেলা মেহেরপুরের উনিশ শতকের প্রথম দশকে শুরু হয়েছে বলে প্রবীণ খেলোয়াড়দের কাছ থেকে জানা যায়। বাতাবী লেবুকে ফুটবল হিসেবে ব্যবহার করে খেলা করার প্রবনতা চালু ছিল দীর্ঘকাল ধরে। দারিয়াপুর গ্রামেও অনেকে ধানের খড় গোলাকার করে বেঁধে ফুটবল হিসেবে খেলা করত। এরপর ১৯৩৯ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মেহেরপুরে টাউন ফুটবল ক্লাব  প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন। এই ক্লাবের তত্ত্ববধানে বর্তমানের স্টেডিয়াম মাঠে ফুটবল খেলা শুরু হয়।পরবর্তীতে দারিয়াপুর গ্রামেও ফুটবল খেলার প্রচলন ঘটে। বর্তমানে দারিয়াপুর গ্রামে দারিয়াপুর ফুটবল একাদশ নামে একটি ফুটবল ক্লাব রয়েছে।
লাঠিখেলা “বাংলাদেশের বাঁশের লাঠি বঙ্গে তীতুমীর
         বিশ্বব্যাপী পরিচিত বাঙ্গালী জাতির ।”
ইতিহাস পর্যালোচনায়  দেখা যায় খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীতে বরেন্দ্রভূমির বিদ্রোহী কৈবত্তদের দলপতি দিবেবাক প্রাথমিক হাতিয়ার লাঠিকে ব্যবহার করে তৎকালীন বাংলার দ্বিতীয় পাল রাজবংশের রাজধানী গৌড় দখল করেছিলেন। খৃষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বে পাক ভারত উপমহাদেশের যুদ্ধে হাতিয়াররূপে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার প্রচলিত ছিল না। তখন দেশী অস্ত্র উপকরণ হিসেবে যুদ্ধে ব্যবহৃত হতো। সৈন্যদলের পাশ্চাত্য ভাগ সাধারণতঃ লাঠি অথবা বল্লম তাতে প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হতো। অর্থাৎ যুদ্ধে লাঠিকে প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করার কথা অনুমান করা হয়ে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে ফকির ও সন্নাসীগন কর্তৃক লাঠিকেই প্রথম অস্ত্ররূপে বেছে নেয়া হয়েছে। নারকেলবাড়িয়ার বাঁশের কেল্লায় সৈয়দ নিসার আলী ওরফে তীতুমীর লাঠিকেই হাতিয়াররূপে ব্যবহার করে বৃটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে  অত্যাচারিত কৃষকরা লাঠি হাতেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কোন কোন ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি  করেছিলেন। বাংলার প্রাচীনতম ঐতিহ্যময় লাঠিখেলার বিশাল ইতিহাস দারিয়াপুর ইউনিয়নসহ মেহরপুরের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ছাড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর প্রেসিডেন্টের জন্মস্থান হচ্ছে মেহেরপুরে।
মাল খেলা বা কুস্তি খেলা প্রাচীন সংস্কৃতির ঐতিহ্যের প্রশাখায় মাল খেলা বা কুস্তি খেলা এক অনবদ্য নৈপুূন্য সম্পন্নখেলা। এক সময় মালখেলা দারিয়াপুরে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ১৯৪৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সমগ্র মেহেরপুরে মাল খেলার প্রচলন লক্ষ্যণীয় ছিল। পরবর্তীতে ক্রমে ক্রমে এ খেলার বিলুপ্তি ঘটেছে। দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে মাল খেলার প্রচলন ছিল চোখেপড়ার মতো।
লাকড়ি খেলা লাকড়ী খেলা দারিয়াপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই খেলা ঢোল ও কাঁসির বাজনার সাথে খেলোয়াড়রা যুদ্ধের ভঙ্গিতে বাহারি পোশাকে খেলতে থাকে। এই খেলা গ্রামের মানুষের কাছে অত্যাধিক জনপ্রিয়। আধুনিকায়নের সাথে সাথে অন্যান্য খেলার সাথে এই খেলাটিও হারিয়ে যাবার উপক্রম প্রায়।
বিবাহ বিষয়ক রিতি-নিতি দারিয়াপুর ইউনিয়নের বিবাহের রিতি-নিতি সমগ্র বাংলাদেশের ন্যায় একইরূপ। প্রাচীন আমলে মুসলিম সূরা অনুসারে বিবাহের কার্যাদি সুসম্পন্ন করা হতো মৌলভী এবং মসজিদের ইমামদের দ্বারা। এ সময় বিবাহ নিবন্ধন করার কোন আইন বা রেওয়াজ প্রচলিত ছিল না। ১৮৭৬  সালে এই উপমহাদেশে বিবাহ নিবন্ধন ১ আইনের ৬ ধারার বিধানমতে যেকোন বিবাহ বা তালাকের বিষয়ে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চালু করা হয়। দেশে এ আইনের প্রচলনের পর মেহেরপুর মহকুমার সর্বপ্রথম মৌলভী আবদুল হাকিম সরকারী মুসলিম বিবাহ নিবন্ধক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মেহেরপুর মহকুমায় এ দায়িত্ব পালন করেন। গাংনিতে মৌলানা নাজির আহমেদ সমসাময়িক সময়ে অত্র এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক অর্ডিন্যান্স জারী করা হয়। এই  অর্ডিন্যান্সের বলে ইউনিয়ন পর্যায়ের চেয়ারম্যানরা স্ব স্ব ইউনিয়নের এক বা একাধিক বিবাহ নিবন্ধক নিয়োগ করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। এই ইউনিয়নে প্রাচীনকাল থেকেই বাল্যবিবাহের প্রথা চালু রয়েছে। বর্তমানে বাল্যবিবাহ আইনতঃ দন্ডনীয় অপরাধ হলেও মেহেরপুরের গ্রামাঞ্চলে শতকরা আশি ভাগই বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে গ্রামের মানুষ শিক্ষিত হওয়ার সাথে সাথে এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বাল্য বিবাহ সম্পুর্ণ রুপে বন্ধ হয়েছে। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো: আবু ইলিয়াসের সময়ে দারিয়াপুর ইউনিয়ন বাল্য বিবাহমূক্ত ইউনিয়নের ক্ষ্যাতি অর্জন করে। 
বর-কনে দেখা আগেকার দিনে অল্প বয়সে ছেলে বা মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের আইন মোতাবেক ছেলে বাইশ বছর এবং মেয়ে আঠারো বছর বয়স হলেই তারা বিবাহের জন্য উপযুক্ত হিসাবে ধরা হয়। কনে নির্ধারণের জন্য বরের পক্ষ থেকে একজন ঘটক নির্ধারন করা হয়। যে বিবাহের সমস্ত রিতি-নিতির মধ্যস্থতা করবে। কনে পক্ষের আর্থিক, সামাজিক, ধার্মিক সমস্ত দিক ঘটক বরপক্ষের কাছে তুলে ধরার পর বর পক্ষের পছন্দ হলে সর্বশেষ কাজ হিসাবে বাকি থাকে কনের চেহারা দেখা ও বিবাহের দিন ধার্য করা। কনে পক্ষেরও একজন ঘটক থাকে যে বরপক্ষের ঘটকের সাথে যোগাযোগ রেখে দেখাশোনার সমস্ত কাজ শেষ করে।
গায়ে হলুদ গায়ে হলুদকে প্রথম দিন ধরে হলুদের তৃতীয় দিন বিবাহ সংঘঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে বরের বাড়ি থেকে কনের গায়ে হলূদ লাগাতে আসে এবং সঙ্গে নিয়ে আসে হলুদ শাড়ি ও বড় ইলিশ মাছ। এখনকার দিনে ইলিশের অপ্রতুলতায় বড় কাতলা বা রুই বা এধরনের বড় মাছ দিয়েই কাজ চালানো হয়।
বিবাহ বরের সামর্থ অনুযায়ী শওয়ারী নির্ধারিত হয়ে থাকে। আগেকার দিনে হাতির পিঠে করে বর আসতো পরবর্তীতে ঘোড়ার পিঠে ও কনেকে নিয়ে যাবার জন্য পালকি নিয়ে আসত। বর্তমানে হাতি, ঘোড়ার, পালকির স্থান দখল করে নিয়েছে কার, মাইক্রো, বাস, হেলিকপ্টার ইত্যাদি। কনের বাড়ি বিয়ের আয়োজন করা হয়। বরের সাথে যে সকল দাওয়াতীরা আসে তাদের বরযাত্রী এবং কনের দাওয়াতীদেরকে বলা হয় কন্যাযাত্রী। এই দিনই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে কনের পিতা-মাতা মেয়েকে বরের সঙ্গে বিদায় করে দেয়।
বৌভাত/ওয়ালিমা বিবাহের পরের দিন বরপক্ষ ওয়ালিমার অনুষ্ঠান করে যেখানে বিবাহের দিন বরপক্ষ থেকে দাওয়াতকৃত কনেপক্ষের আত্নীয়স্বজনদের আপ্যায়ন করা হয়।
আতিথেয়োতা ও আচার ব্যবহার মেহেরপুরের সর্বস্তরের অধিবাসীদের জীবনধারায় অকৃত্রিম আতিথিয়োতা আজো বিরাজমান। দারিয়াপুর ইউনিয়নও এর ব্যতিক্রম নয়। গ্রামাঞ্চলে গোরস্থ বাড়ীতে বেড়াতে গেলে চিড়া, মুড়ি মুড়কী অথবা গুড়ের শরবৎ দেওয়ার রেওয়াজ চালু ছিল। আর সেই সাথে মুরগীর গোস্ত দিয়ে ভাত খেতে  দিতো। এছাড়া নারিকেলের নাড়ু, দই, সন্দেশ খাবার হিসাবে দেয়া হতো বিয়ে মুসলমানী, অন্ন প্রসন্ন জন্মবার্ষিকীতে অনেক সময় আত্মীয় বেড়াতে আসলে তাদের লুঙ্গী গেঞ্জী, শাড়ী শায়া উপহার দেয়ার রীতি রয়েছে। বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত হয়ে গেলে লগনে বিশেষ করে ইলিশ অথবা রুই মাছ আর এক হাড়ি মিষ্টি বর কনে উভয় পক্ষের বাড়ীতে পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে।
দারিয়াপুর ইউনিয়নে প্রচলিত প্রবাদ ও বচন
মেহেরপুরের সমগ্র অঞ্চলেই কমবেশী বিভিন্ন প্রবাদ ও বচনের প্রচলন রয়েছে। এ সকল প্রবাদ ও বচন সাধারণতঃ অশিক্ষিত রমণীরা তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনে কথোপকথের প্রসঙ্গে ব্যবহার করে থাকেন। দারিয়াপুর ইউনিয়নে প্রচলিত প্রবাদ ও বচনের কয়েকটি উপমা এখানে তুলে ধরা হলোঃ-
(১) গাঁয়ের মধ্যে হুলস্থুল, জানেনা আমার আবদুল।
(২) লোহায় লোহায় এক হবে, কামার শালা পর হবে।
(৩) পারেনা সুঁচ গড়াতে, যায় বন্দুকের বায়না নিতে ।
(৪)  মাওড়া নিও সাথে ঝাঁটা নিও হাতে  ।
(৫) কে বুলিছে কিসের কথা  পা দি চুলকাই মাথা/কে বলেছে কি পানতাভাতে ঘি।
(৬) আসল ঘরে মুশুল নেই বাদায় চরে হাঁস।

(৭) রঙিনির রং চিন্তা দু:খিনির ভাতের চিন্তা।

(৮) আপন কথা কয়না শালি পরকে বলে টেবোগালী।

দারিয়াপুর ইউনিয়নে প্রচলিত কুসংস্কার

খেলাফত আন্দোলনের ফলে অবিভক্ত নদীয়া জেলার মুসলমানদের সমাজ ও পারিবারিক জীবন থেকে অনেক কুসংস্কার বিদূরিত হলেও দারিয়াপুর ইউনিয়নের অনেক অভিজাত পরিবারে এখানো বহু কুসংস্কার বিদ্যামন। এছাড়া, দরিদ্র ও মূর্খ হিন্দু- মুসলমানরা এখনো প্রচন্ডভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন রয়েছে। দেখা যায়, মেহেরপুরের অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রয়েছেন। যেমন: ডিম খেয়ে পরীক্ষা দিতে গেলে ভালো ফল হয় না। শাক ভাত খেলে পরীক্ষায় পাশ হয়। টিকটিকির ডাক শুনে অনেক সময় শুভ অশুভ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। সোমবারে বাঁশের ঝাড় থেকে বাঁশ কাটা হলে অমঙ্গল হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রথমে নগদ বেচাকেনা করাকে বলা হয় বউনি। এই বউনি নাহলে মেহেরপুরে কোন ব্যবসায়ী প্রথমে কোন দ্রব্যাদি বাকি দেন না। এতে নাকি ব্যবসার অমঙ্গল হয়। শনিবার, মঙ্গলবার কেউ মাথার চুল অথবা হাতের নখ কাটে না।  রাস্তায় চলাচলের সময় কোন শিয়াল যদি ডান দিক থেকে বাম দিকে গমন করে তাহলে নাকি সেদিনটি শুভ হয়। শালিক পাখির ঝাঁক যদি কোন বাড়ীতে একষাতে কিচির মিচির করে তাহলে সেই বাড়ীতে সেদিন দাম্পত্য কলহ বাদে। পেঁচা পাখি রাতের বেলায় যদি বাড়ীর কাছেই কোন গাছের ডালে বসে বিকট শব্দে ডাকে তবে গৃহস্বামী ধারণা করেন নিশ্চয়ই বাড়ীর ছোট ছেলের অমঙ্গল হবে। আর সেই কারণেই পেঁচা পাখি তাড়িয়ে দেয়া হয়ে থাকে। খালি কলসী নিয়ে কারুর বাড়ীতে সকালে পানি আনতে গেলে তাতে অমঙ্গল হয়। তাই এই কুসংস্কার নিয়ে অনেক সময় ঝগড়া বিবাদ হওয়ার ঘঠনা একেবারে বিরল নহে। এমনি ধরনের অসংখ্য কুসংস্কার দারিয়াপুর ইউনিয়নের জনজীবনে বর্তমানে প্রচলন রয়েছে।

 

 

   

 

 

 

 

 

 

মহাজনপুরের আঞ্চলিক ও প্রচলিত ভাষা:১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কুষ্টিয়ার লালন শাহের লালনগীতির ব্যাপক চর্চার প্রভাব মহাজনপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন কে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া মহাজনপুর  ইউনিয়নের লোক-সংস্কৃতি, বাউলগীতি, আঞ্চলিকগীতি, নাট্যচর্চা, ভাসান গানও মানিকপীরের গান উল্লেখযোগ্য।

মহাজনপুর ইউনিয়ন  নদীয়ার প্রাচীন জনপদ হওয়ায় এখানে লোকসংস্কৃতি বা গ্রামীণ সংস্কৃতি বিভিন্ন ভাবেচর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্যে রূপান্তরি তহয়েছে। বাঙালীর সমাজজীবনে নানা উৎসব আয়োজনে নানা ধরণেরগীত, কবিগান, ভাবগান, পুঁথিপাঠ, মেঠোগান, মানসারগান, ভাসানগান, ছেলেনাচানোগান, মানিকপীরেরগান, বোলানগান, অষ্টগান,  গাজীরগীত ও কৃষ্ণ গান সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। লোক সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রভাব ও এক শ্রেণীর প্রভাবশালী সমাজপতিদের বিদ্রুপান্তক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ অন্তরায় সৃষ্টি করলে ও বহু কাল ধরেই লোক সংস্কৃতি মহাজনপুরের সমাজ জীবনে নানা ভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

(ক) বাউল গীতিঃ

বৃহত্তর কুষ্টিয়ার অঞ্চল হিসেবে মহাজনপুর ইউনিয়ন কুষ্টিয়ার বাউল সম্রাট লালন শাহের প্রভাবে শত শত বাউল অনুরাগী ও বাউলশিল্পীর সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা মানব ধর্মের কথা বলেন এবং দেহ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। বাউলগণ দেহ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও মরমী গানের মাধ্যমে মানুষকে অতিন্দ্রীয় লোকে বিচরণ করাতে সক্ষম হন।মেহেরপুরে এখনো শত শত বাউল অনুরাগী তাঁদের ব্যক্তি জীবনে বাউল সঙ্গীত ও লালনের জীবনাদর্শ চর্চা অব্যাহত রেখেছেন।

(গ) মানিক পীরের গানঃ

মানিক পীর মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের গৃহস্থের নিকট সমভা বেশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন।মেহেরপুরের লোক সংস্কৃতির ঐতিহ্যে মানিকপীরের গান এক অমূল্ যসম্প দহিসেবে স্বীকৃত।মহাজনপুরের গ্রামা ঞ্চলে বিশেষ করে মহাজনপুর ও গোপালপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে মানিক পীরের গানের বেশ প্রচলন রয়েছে। পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে মানিকপীরের গান গেয়ে কেউ কেউ ভিক্ষা করে বেড়ায়। ভিক্ষার দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে ১লা মাঘ একটি নির্দিষ্ট স্থানে রান্না করে তবারক হিসেবে বিলি করা হয়।

মহাজনপুর অঞ্চলে প্রচলিত মানিকপীরের গানের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলোঃ-

‘‘মানিকের নামে তোমরা হেলা করো না

মানিকের নাম থাকলে বিপদ হবে না।

মানিকের নামে চাল-পয়সা যে করিবে দান

গাইলে হবে গরম্ন-বাছুরক্ষেতেফলবেধান।’’

মানিকপীরের গানে তাঁর মাহাত্ম এ না ভিক্ষা দেয়ায় গো-মড়কের কাহিনী বলা হয়ে থাকে।

(ঘ) ভাসানগানঃ

মহাজনপুর ইউনিয়িনের বিভিন্ন গ্রামে ভাসান গানের দল রয়েছে।এই গানের বৈশিষ্ট হলো- তিনটি পালা করে গায়করা গান গেয়ে থাকেন।জন্ম পালা, বাঁচার পালা ও মৃত্যু পালা।মৃত্যু পালা হচ্ছে শ্রোতাদের কাছে সব চেয়ে প্রিয়।শীতকালে বাড়ী বাড়ী ভাসান গানের আসর করে থাকে । সারারাত ধরে এ গানের আসর চলে থাকে। ভাসান গানের মধ্যে বেহুলা স্বামী বিয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বর্ণনা দেয়া হয়ে থাকে তা শ্রোতার মনকে বিশেষ ভাবে আলোড়িত করে থাকে।ভাসান গানের কিছু্ অংশ এখানে তুলে ধরা হলোঃ-

‘‘ওকিসাধ আছে হে দিতে লকায়ের বিয়ে

আর কিছু দিন রাখ বো ঘরে ধুলো খেলা দিয়ে।’’

(ঙ) বিয়েরগানঃ

লোক সংস্কৃতির ভান্ডার অফুরন্ত।প্রতিনিয়ত এর উপাদান বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।আধুনিকতার উষ্ণ আবেদনের প্রেক্ষিতে অতীতের অনেক লোক সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে।তবে  মহাজনপুরের গ্রামগুলোতে অশিক্ষিত মেয়ে রা বিয়ের গানের শতশত পংক্তি অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারে।এ সমস্ত গান তাঁরা নিজে রাই সৃষ্টি করেন।মহাজনপুরের গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত বিয়ের গান, ঢেঁকি মোঙ্গলানোর গান, ক্ষীর খাওয়ানোর গান এখানে তুলে ধরা হলোঃ-

বিয়ের গানঃ‘‘দুলা ভাই গিয়েছে শহরে, আনবে নাকের নথ রে

সেই নথ নাকে দিয়ে নাক ঘুরিয়ে নাচ বোরে।’’

(চ) ক্ষীরখাওয়ানারগানঃ

‘‘আলুয়ারচালেকাঞ্চনদুধেক্ষীরোয়াপাকালাম

সেইনাক্ষীরোয়াখেতেগরমিলেগেছে।

কোথায়আছবড়ভাবীপাক্কাহিলোয়ররে।’’

(ছ) ঢেঁকি মংলানোর গানঃ হিন্দু বিয়েতে এধরনের গানের প্রচলন আছে। মহাজনপুর এলাকায় প্রচলিত গানের একটি উদাহরণ তুলে ধরা হলোঃ

ওরে লাল মোলামের ঢেঁকি তুই মাথায় সিঁদুর ওঠে

ওরেমাছ এনেছে বড় রম্নই পাঁচ মেয়েতে কোটে

লাল মোলামের ঢেঁকি কুসুম কাঠের পোয়া

ভাসুর যদি তেমন হয় ছেমায় ঢেঁকি পেতে দেয়।’’

(জ) শারী গানঃ

এই গান হচ্ছে কর্মসংগীত।মহাজনপুর অঞ্চলে শারী গানের প্রভাব আজও বিদ্যমান।পাকা ঘরের জলছাদ পেটানো কিংবা কোন ভারী কাজের জোশ সৃষ্টির জন্য শারী গান গাওয়া হয়ে থাকে।

(ঝ) জারীগানঃ

জারীগান মূলতঃ ইসলামী দৃষ্টি কোন থেকে সৃষ্টি।মহাজনপুর ইউনিয়নে মহররমের সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে গায়ক এনে জারী গানের অনুষ্ঠান করা হত।এছাড়াও অনেক জারী গায়ক দল এ অঞ্চলে রয়েছে।জারী গানের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ-

‘‘ঈমান যে না আনিবে মক্কার উপরে

গোনা গার হয়ে যাবে দোযখ মাঝারে

আরে রোমের ও শহরে ছিল

ইব্রাহীম পায়গম্বর

বহু দিবস বাদশাহী করে এই দুনিয়ার পর।’’

(ঞ) শাস্ত্রগানঃ

এক টানা বাদলার দিনে শাস্ত্র গানের কদর দেখা যায়।জমিতে নিড়ানোর সময় অথবা ধান লাগানোর সময় শাস্ত্র গান গাওয়া হয়।গ্রামের গৃহস্থের বাড়ীর বৈঠক খানায় বৃষ্টির দিনেক খনও কখনও শাস্ত্র গানের আসর বসে শাস্ত্র গানের কাহিনী অনেকটা বর্ণনা মূলক।শাস্ত্রগানের উপমাঃ-

‘‘ঈমান খাঁটি ভবের খুঁটি শাস্ত্রের পরিচয়

ঈমান দিয়ে দেল কে আগে খাঁটি করা চাই,

নইলে নামাজ হবে নয়

আছে সত্য ঠিক যথার্থ তোমারে জানাই।’’

(ট) ভাটিয়ালী গানঃ

মহাজনপুরের গ্রামাঞ্চলে এক সময় ভাটিয়ালী গানের ব্যাপক প্রচলন ছিল।ইদানিং কালে অনেক কমে গেছে।গরম্নর গাড়ীর গাড়োয়ান, নৌকার মাঝি এবং মাঠের রাখালী ভাটিয়ালীগানের গায়ক হিসেবে আজও এই প্রাচীন লোক সংস্কৃতিকে ধারণ করে রেখেছে।

(ঠ) অষ্টগানঃ

চড়ক পূজায় অষ্টগান পরিবেশিত হয়ে থাকে।চড়ক পূজার ১৫দিন পূর্বে পাড়ায় পাড়ায় অষ্ট গানের দল বেঁধে অষ্টগান পরিবেশিত হয়ে থাকে।মহাজনপুরে অষ্টগান গাওয়ার জন্য তেমন কোন দল এখন আর নেই।

(ড) কীর্তনঃ

কীর্তন হচ্ ছেহিন্দু বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মীয়গান।মহাজনপুর ইউনিয়ন অনেক সৌখিন কীর্তন গায়ক রয়েছেন।কীর্তন সঙ্গীত মূলতঃখোল করতাল ও খঞ্জনী বাজিয়ে বৈষ্ণ ববৈষ্ণবীরা পরিবেশন করে থাকেন।

(ঢ) পালা বা যাত্রা গানঃ

পালা বা যাত্রা গান মহাজনপুরের সর্বত্র এখন ও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি লোক সংস্কৃতি হিসেবে বিদ্যমান।রূপবান যাত্রা, ভাসানযাত্রা, ইমামযাত্রা, আসমানসিংহের পালাগান উলেস্নখযোগ্য।শীত কালের পুরো সময় এখান কার গ্রামাঞ্চলে, এমন কি ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্র স্থলে ও যাত্রাগানের আসর বসে থাকে।মহাজনপুর ইউনিয়ন সরকারি ভাবে নিবন্ধিত কোন যাত্রা দল নেই।এক সময় ইউনিয়নের গোপালপুর,মহাজনপুর , কোমরপুর গ্রামের ক্লাবে যাত্রাগানের প্রচলন ছিল।

(ণ) মহাজনপুর ইউনিয়নেরের প্রচলিত প্রবাদ বচনঃ

মহাজনপুর ইউনিয়নের সমগ্রগ্রামে কম বেশী বিভিন্ন প্রবাদ ও বচনের প্রচলন রয়েছে।এসকল প্রবাদ ও বচন সাধারণতঃ অশিক্ষিত রমণীরা তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনে কথোপকথের প্রসঙ্গে ব্যবহার করে থাকেন।প্রচলিত প্রবাদ ও বচনের কয়েক টি উপমা এখানে তুলে ধরা হলোঃ-

(১) ‘‘গাঁয়ের মধ্যে হুল স্থুল, জানেনা আমার আবদুল।’’

(২) ‘‘ভাইয়েতভাত, ভাজের হাত।’’

(৩) ‘‘লোহায় লোহায় এক হবে, কামার শালা পর হবে।’’

(৪) ‘‘পারে না সুঁচ গড়াতে, যায় বন্দুকের বায়না নিতে’’

(ত) ছড়াগানঃ

মহাজনপুর ইউনিয়নের ছড়াগান আজ বিলুপ্তির পথে।জারীগান গাওয়া বয়াতিরা কখনো কখনো ছড়াগান গেয়ে থাকেন।

‘‘ বন্দী খোদা বন্দী রাসুল ফাতেমা

ঢাল হয়ে বসো ছেরে

তুফান লাগ বেনা।

(থ) ভাবগানঃ

মহাজনপুন ইউনিয়নের গ্রামাগুলোতে ভাবগান ব্যাপক জনপ্রিয়।ভাবগানকে গ্রামে মারফতীগান বলা হয়ে থাকে।

‘‘কবে সাধুর চরণ ধূলি লাগবে মোর গায়

আশা সিন্ধু হয়ে বসে আছি তাই।’’

(দ) পুঁথিগানঃ মহাজনপুর ইউনিয়নে পুঁথিগান প্রচলিত আছে।নিম্নে একটি উদাহরণ দেয়া হলো

‘‘ওরে ভাই বলি তাই আজব ঘটনা

ওরে সাপ খেলাই সুপুড়ের মেয়ে

নামেতে জরিনা।’’

(ধ) পুঁথিপাঠঃ

মহাজনপুর ইউনিয়নে মুসলমানদের মধ্যে প্রাচীন আমল থেকেই পুথিপাঠের প্রচলন রয়েছে।সোনাভান, গাজীকালু চম্পাবতী, জঙ্গলনামা, ইউসুফ জুলেখাবিবি বিভিন্ন ধরনের পুঁথি এই  অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে আছে।

(ন) কবিগানঃ

প্রেমের উপাথ্যান, বিরহ বিয়োগ ব্যাথা এমনকি দাম্পত্য জীবন নিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত ভাষাবিদরা কবিতার ছন্দে প্রতি যোগিতার আয়োজন করে থাকে।এগানগুলো প্রায় ইস্বরচিত।কবিরা নিজে নিজেই গান তৈরী করে থাকে।

‘‘ কবি গান রসের সাগর ভাই

মাঝে মাঝে জোয়ার এলে পেট পুরে খাই

কবি মানে কাব্য হলো শাস্ত্রে তাই প্রমাণ দিলো

আমি বলে যাই কবি গান রসের সাগর ভাই।’’

(প) ভাটিয়ালীগানঃ

মহাজনপুর এক সময় ভাটিয়ালীগানের ব্যাপক প্রচলন ছিল।ইদানিং কমেগেছে।গরুর গাড়ী গাড়োয়ান, নৌকার মাঝি ও মাঠের রাখাল ভাটিয়ালীগান গেয়ে শুনাত।

(ফ) গাজনগানঃ

মহাজনপুর ইউনিয়নে চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক পুজা উপলক্ষে নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে গাজন গানের প্রচলন রয়েছে।গাজন গান সাধারণতঃ দোতারা নিমিত্তে পরিবেশিত হয়ে থাকে।

(ব) ব্রতকথাঃ

হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানা দিতে ব্রত কথা বা ব্রতগীত প্রচলিত রয়েছে।যেমন ইটা কুমারের ব্রত, জামাই ষষ্ঠি, পুণ্যি পুকুর প্রভৃতি ব্রত পালনের সময় ছড়া আকারে ব্রত কথা পঠিত হয়ে থাকে।

(ভ) পুতুলনাচঃ

এক সময় মহাজনপুর ইউনিয়নে পুতুল নাচ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।টিকিট কেটে পুতুলনাচ দেখার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভীড় জমাতে দেখাগেছে।এইউনিয়নে বর্তমানে পেশাদার পুতুলনাচের কোন দলনেই।তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এখানে পুতুল নাচ প্রদর্শন করতে আসে।পুতুলনাচ শিশু কিশোরদের বেশ আনন্দ দিয়ে থাকে।

(ম)  নকশীকাঁথাঃ

লোকসংস্কৃতির ইতিহাস একেবারে খাটো করে থেহার অবকাশ নেই।নকশীকাঁথা ও পাটদিয়ে হাতের তৈরী‘‘ছিকা’’ আমাদের লোকসংস্কৃতির অমূল্য নিদর্শন বলা যেতে পারে।নকশীকাঁথা এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বিয়ের সময় কনের পক্ষ থেকে বরপক্ষ কে উপহার দেয়া হয়ে থাকে।

(ষ) নাচঃ

মহাজনপুর ইউনিয়নের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যে নাচ একটি উল্লেখযোগ্য অবদান।গ্রামে বিয়ের বাড়ীতে বর ও কনের উভয় পক্ষের যুবক যুবতী এমন কি বুড়ো-বুড়িরা নাচে অংশ গ্রহন করে থাকেন।তবে প্রাচীন কালের তুলনায় আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে।

 

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)